সিমলিপাল , জামুয়াণিতে এক রাত্রি ,নওয়ানাতে এক রাত্রি এবং চাহালাতে এক রাত্রি
আমি আগেই বলেছি জঙ্গলে ঘুরতে যেতে আমার খুব ভালো লাগে। এবারও সে রকমই মার্চের ইয়ার এন্ডিং শেষ হওয়ার পর, এপ্রিলের শুরুতেই আমরা সবাই মিলে প্ল্যান করতে লাগলাম যে এবার কোথায় যাবো । আমরা ৮ জন । এরমধ্যে পাঁচজন পাহাড়ে যেতে চাইল আর বাকি আমরা সবাই জঙ্গলে । তর্ক শুরু হলো। পাহাড় না জঙ্গল ? যাইহোক অনেক তর্ক-বিতর্ক করে জয়ী হলো জঙ্গল ।
আমার মনে সিমলিপাল যাওয়ার ইচ্ছা টা অনেক দিন ধরেই ছিল । যাইহোক সুযোগ বুঝে বললাম তারপরে অনেকে রাজি হয়ে গেল, কয়েকজন একটু কিন্তুবোধ করলেও ,বাকি সবাইকার জোর যারে তারা আর কিছু বলল না ।
এবার আমাদের কাজ হল সিমলিপাল এর কোন এলাকায় একটা ফরেস্ট রেস্ট হাউস বুক করা। আমরা সেই আশায় ফোন করলাম ওড়িশার বারিপদার বনদপ্তরে।
কথাবার্তায় তিন দিনের প্ল্যান বানানো কমপ্লিট । জামুয়াণিতে এক রাত্রি ,নওয়ানাতে এক রাত্রি এবং চাহালাতে এক রাত্রি ।
এবার বলি সিমলিপাল যাওয়ার আমার এত ইচ্ছে কেন সিমলিপাল এ যেমন আছে বাঘের বাসা তেমনি লেপার্ড ,হাতি ,বাঘ ভাল্লুক ,4-5 রকমের হরিণ, কাঠবিড়ালি ,নেকড়ে ,হায়েনা, 4 শিংয়ের অ্যান্টিলোপ ,শেয়াল নীলগাই ,প্যাঙ্গোলিন, উড়ন্ত কাঠবিড়ালি ,হনুমান আছে ।
তাছাড়াও আছে হর্নবিল ,পিফাওল ,রেড জঙ্গল ফাউল ,ঈগল, ময়ূর ,কথা বলা ময়না ইত্যাদি প্রায় 231 জাতের পাখি এবং পাইথন কিং কোবরা ভাই পার্কে কুমির ইত্যাদির নানা জাতের সরীসৃপ উদ্ভিদ 182 রকমের অর্কিড ।
মনিরখানের মহারাজদের একসময়ের মৃগয়াক্ষেত্র এই সিমলিপাল ।আরো কত জন্তু-জানোয়ার ছিল তা সহজেই অনুমেয় ।এখানকার বেশ কয়েকটি নদীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বুড়িবালাম ফল-ফলাদি, খইরি ইত্যাদি।
ভোর বেলায় আমরা সবাই পৌঁছে গেলাম হাওড়া স্টেশন। ভোর ছটা তে ধৌলি এক্সপ্রেসে সবাই উঠে বসলাম। ট্রেনের সময়টা বেশ সবাই মিলে গল্প করে ট্রেনের টুকিটাকি খাবার খেয়ে কেটে গেল। পরের দিন সকালে 9:35 এ পৌছালাম বালেশ্বর এ । সিমলিপাল ঘোরার জন্য গাড়ি বুক করা ছিল। গাড়ি স্টেশনে এসে গেছিল ।তারপরে ব্রেকফাস্ট করে আমরা চললাম বাড়িপদার পথে।
তারপর আমরা পৌঁছালাম সিমলিপালের চেকপোষ্টে। এখানে মাথাপিছু এন্ট্রি ফি নেয়া হলো এবং গাড়ি এবং ক্যামেরার জন্য আলাদা টাকা । আমাদের সমস্ত ব্যাগ চেক করা হলো।
তারপর আমরা বনের মধ্যে দিয়ে পৌছালাম জামুয়ানী ফরেস্ট হাউসে। ধারে কাছে কেউ কোথাও নেই।
পৌঁছে বুঝতে পারলাম মশার উপদ্রব এখানে প্রচন্ড ।তার সাথে ঝিঁঝির আওয়াজ কানে এসে পৌঁছালো। সবাই ক্লান্ত ছিলাম খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।
পরেরদিন সকালবেলায় বনের মধ্যে দিয়ে যেতে লাগলাম পৌঁছে গেলাম জড়ানদায় ।জায়গাটা খুব নির্জন একটা বিশাল খাত আর অন্যদিকে একটা অপূর্ব ঝরনা।
এখানে একটা শর্ট ফিন আছে যেখানে বিভিন্ন পশুরা আসে নুন খেতে । আস্তে আস্তে এখানে ঘুরতে লাগলাম ।এই করতে করতেই সূর্যাস্ত তারপরে আমরা অন্ধকারে গাড়ি করে আবার ফিরে এলাম । পরদিন যথারীতি ভোর ভোর উঠে যে যার মত বেরিয়ে পড়লাম ।সকালবেলা বনের রূপ অন্যরকম কত নিশ্চিন্ত।
তারপরে আবার গাড়ি করে লাল ধুলো ওড়াতে ওড়াতে ছুটন্ত হরিণ, সজারু ,বড় কাঠবিড়ালি, বন বিড়াল ,দু-একটি বাই সন দেখতে দেখতে উত্তেজনার সঙ্গে চললাম পরবর্তী গন্তব্য চাহালা । রাস্তায় যেতে যেতে বহু হাতি দেখলাম। তারপরে আমরা পৌঁছালাম চাহালার রেস্ট হাউস সুন্দর জায়গা ।সামনে ওয়াচ টাওয়ার । এলিফ্যান্ট করিডোর।
সন্ধে হতেই ওয়াচ টাওয়ারে গিয়ে দাঁড়ালাম। কয়েকটা হরিণ সামনে দিয়ে চলে গেল। তার পরে বিভিন্ন পশু পাখির আওয়াজ পেতে লাগলাম ।ঠিক বুঝতে পারছিলাম না কোনটা কার ডাক, খানিকক্ষণ বসে থাকার পর দেখলাম কুড়ি পঁচিশটা হাতির দল ফিরছে ,পিছনে তিন-চারটে একদম ছোট্ট বাচ্চা হাতি ।
তারপর টিফিন করে আমরা ওয়াচ টাওয়ারে উঠলাম ।এখান থেকে জঙ্গল টা অনেক দূর অব্দি দেখা যায় ।দেখলাম অনেকগুলো হরিণ আমাদের রেস্টহাউজের সামনে দিয়ে ঘুরছে।
তার পরে বসে রইলাম এই শান্ত নির্জনতা টা খুব ভালো লাগছিল। শহরে এরকম নির্জনতা পাওয়া যায় না। আর সাথে ঝিঝিরাও ।
সকাল বেলা উঠেই ফেরার প্রস্তুতি। গাড়ি এসে দাঁড়িয়ে আছে ,তাও ইচ্ছা হলো জঙ্গলটা এক বার ঘুরে আসার। দেখলাম লাল রঙের কাঠবিড়ালী। কাঠবিড়ালী সাধারনত এখানে দেখা যায় না, এখানকার কাঠবিড়ালি গুলো থেকে অনেক বড়।
গাড়ি করে আমরা আবার পৌঁছে গেলাম স্টেশনে সিমলিপাল কে বিদায় বলে উঠে পরলাম ট্রেনে।
Comments
Post a Comment